রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন, থেমে থেমে গুলির শব্দ

বাংলাদেশে ঢোকার জন্য অপেক্ষা করছেন কয়েকজন রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের ওপর ফের নির্মম অত্যাচার শুরু হয়েছে গত বৃহস্পতিবার (২৪ আগস্ট) থেকে। উগ্রপন্থা দমনের অজুহাতে প্রতিদিন বোমা মেরে গ্রামের পর গ্রাম ও সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে দেশটির সরকারি বাহিনী। জঙ্গি গোষ্ঠী ‘আলকিন’ ও ‘আরসা’র সদস্য দাবি করে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এসব এলাকার তরুণদের। অভিযোগ পাওয়া গেছে, এসব তরুণদের হত্যা করা হচ্ছে।
সোমবার (২৮ আগস্ট) সীমান্ত ফাঁড়ি দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা একাধিক রোহিঙ্গা ও রাখাইন রাজ্যের একাধিক সূত্র এসব বিষয় নিশ্চিত করেছে। এদিকে, সীমান্তবর্তী এলাকায় রবিবার (২৭ আগস্ট) সন্ধ্যার পর থেকেই থেমে থেমে শোনা যাচ্ছে গুলির শব্দ। সোমবার সকালে সরেজমিনে সীমান্ত এলাকায় গিয়েও শোনা গেছে গুলির শব্দ। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্তও (দুপুর সাড়ে ১২টা) গুলির শব্দ পাওয়া গেছে। সকালের তুলনায় এর পরিমাণ আরও বেশি।
মিয়ানমার সীমান্তের একাধিক পয়েন্ট পরিদর্শন করে দেখা গেছে, কক্সবাজারের উখিয়ার উপজেলার রহমতেরবিল ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে থেমে থেমে শোনা যাচ্ছে গুলির শব্দ ও মানুষের আর্তচিৎকার। সীমান্তের ওপারের আকাশে দেখা গেছে কালো ধোঁয়া। রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা বলছেন, সে দেশের সেনাবাহিনী গণহারে তরুণদের আটক করে নিয়ে যাচ্ছে। যাদের ধরতে পারছে না তাদের গুলি করা হচ্ছে। বাড়ি ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে নিঃস্ব করা হচ্ছে।
সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানান, সীমান্তের ওপারে মঙ্গ শহর পর্যন্ত বাংলাদেশের মোবাইল ফোন কোম্পানির নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। তাদের অনেকেই মিয়ানমারের টেলিকম কোম্পানির পাশাপাশি বাংলাদেশের টেলিকম কোম্পানির সিম কার্ডও ব্যবহার করে থাকেন। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা কয়েকজনের কাছে পাওয়া যায় সীমান্তের ওপারের কয়েকজনের বাংলাদেশি মোবাইল নম্বর। সেই নম্বরগুলো ব্যবহার করেই এ প্রতিবেদক কথা বলেন তাদের সঙ্গে।
রাখাইন রাজ্যের ঢেঁকিবনিয়ার চাকমাকাটা গ্রামে বসবাসকারী ইমাম হোসেন মোবাইল বলেন, ‘রবিবার খুব ভোরে সেনাবাহিনীর একটি দল গ্রামে প্রবেশ করে স্থানীয় আব্দুস সালামের ছেলে জহিরুল ইসলাম, আলী আহমদের ছেলে করিম উল্লাহ ও মিয়া হোসেনের ছেলে আব্দুর শুক্কুরকে আটক করে নিয়ে যায়। এসময় তারা পালিয়ে পাশের পাহাড়ে আশ্রয় নেন। তবে ওই তিন তরুণের ওপর বর্বর নির্যাতন চালিয়ে অজ্ঞান অবস্থায় জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়। তারা সুযোগ পেলে হয়তো বাংলাদেশে পালিয়ে আসবে।’
রাখাইন রাজ্যের ঢেঁকিবনিয়ার লারগাপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল আবছারও মোবাইল ফোনে জানান, রবিবার সন্ধ্যায় সেনাবাহিনীর একটি দল তাদের গ্রামে আসে। তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনীর একটি দল রবিবার সন্ধ্যায় বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি শুরু করে। যেসব বাড়িতে মানুষ নেই, তাদের বাড়ি বোমা মেরে জ্বালিয়ে দিতে থাকে। যখন যাকে সামনে পাচ্ছে তাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে।’
মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে এসেছেন এসব রোহিঙ্গাসোমবার সকালে উখিয়ার পালংখালী আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা মৌলভী শফিউল্লাহ বলেন, ‘আমার গ্রামের বাড়ি ঢেঁকিবনিয়ার ফকিরপাড়ায়। গত দুই দিন ধরে সেখানে সেনাবাহিনী বর্বর নির্যাতন চালাচ্ছে। বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে তরুণকে আটক করে নিয়ে যাচ্ছে।’ এমনকি প্রকাশ্যে অনেককে হত্যা করতে দেখা গেছে বলেও জানান তিনি।
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোজাফফর আহমদ বলেন, ‘সীমান্তের নাফ নদী সংলগ্ন চিংড়ি ঘের থাকায় সেখানে স্থানীয় লোকজনের যাতায়াত তেমন নেই। তবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী প্রায় হাজারখানেক রোহিঙ্গা নদীর পারে অবস্থান করছে। ওপারে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ পাচ্ছি। শুধু তাই নয়, রোহিঙ্গা নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের কান্নার আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছে।’
মিয়ানমার সীমান্তের ধামনখালী গ্রামের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম জানান, রবিবার সন্ধ্যা থেকেই ওপারে থেমে থেমে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। গুলির শব্দ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর আগুনের শিখাও দেখতে পান তারা।
এদিকে, রবিবার বিকালে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবুল হোসেন সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশের কোনও সুযোগ নেই। এখন সীমান্ত সীল করে দেওয়া হয়েছে। কেউ যদি জিরো পয়েন্ট ক্রস করার চেষ্টা করে তাহলে তাদের সুমোচিত জবাব দেওয়া হবে।’